গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় এক বছর পরও জাতি জানে না কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন কবে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও তৃতীয় মাত্রার সঞ্চালক জিল্লুর রহমান।
তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক অদ্ভুত এবং অস্থির সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। যেখানে বিপ্লব বা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরেও অভ্যুত্থানের চেতনা অনুপস্থিত, বিপ্লব অনুপস্থিত। আর নির্বাচনের আগেই ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে।
পরিবর্তনের স্বপ্নে বিভোর জনগণের সামনে এখন শুধু জিজ্ঞাসা। নির্বাচন কবে হবে? ডিসেম্বরে, ফেব্রুয়ারিতে নাকি আরো পরে। এই সময় নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হলেও তা যেন ধীরে ধীরে একটি অদৃশ্য নাটকে পরিণত হয়েছে।
রবিবার (২২ জুন) ইউটিউবে প্রকাশিত এক আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি।
জিল্লুর রহমান বলেন, এ মাসেই বিএনপি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে লন্ডন বৈঠকের পর যে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হলো, সেখানে বলা হয়েছে নির্বাচন হতে পারে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তা যেন বিএনপির দীর্ঘদিনের দাবিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এত দিন যে বিএনপি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল, ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন চাই, পারলে তারও আগে। সেই অবস্থান থেকে সরে গিয়ে তারা যেন সরকার নির্ধারিত সময়সীমার ফাঁদে আটকে গেল।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা আপাতত শান্তির বার্তা দিলেও এর ভেতরে রয়েছে গভীর কৌশল। সরকার খুব চতুরভাবে বা চতুরতার সঙ্গে এই বিবৃতির মাধ্যমে বিএনপির আন্দোলনকে ডিঅ্যাক্টিভেট করে ফেলেছে। রাজপথে আর কোনো উত্তাপ নেই। কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা নেই। জনসম্পৃক্ততাও হ্রাস পেয়েছে।
এটি এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে মনে হচ্ছে, আন্দোলনের অদম্য স্পৃহা এখন শুধুই স্মৃতি। যদিও বিএনপি চেষ্টা করছে, একে একটি কূটনৈতিক জয় হিসেবে দেখাতে। অনেক বিএনপির নেতাকেই মনে হচ্ছে আকাশে ভাসছেন তারা।
তৃতীয় মাত্রার সঞ্চালক বলেন, বাস্তবে বিএনপি এই অবস্থান হঠাৎ পাল্টে ফেলায় কর্মী এবং সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তারা প্রশ্ন করছে, এত দিন আন্দোলন মিছিল সমাবেশ সবই ছিল নির্বাচনের সময়সীমাকে সামনে রেখে। এখন কেন এই নমনীয়তা? সরকার কি কোনো শর্তে রাজি হয়েছে, নাকি বিএনপি ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য চাপে পড়ে নমনীয় হয়েছে বিএনপি। যাদের পদত্যাগ দাবি করেছিল বিএনপি, এখন তাদেরও মেনে নিচ্ছে, এই প্রশ্নগুলো আরো ঘনীভূত হয়।
জিল্লুর রহমান বলেন, যখন দেখা যায়, জনগণ এই সময়সীমার খেলায় তেমনভাবে সম্পৃক্ত নয়। শহুরে মধ্যবিত্ত তরুণ ভোটার, নারী ভোটার এবং পেশাজীবীদের বড় অংশ আজও অনিশ্চয়তায় ভুগছে। তাদের মধ্যে আগ্রহ, আশাবাদ এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান অনুপস্থিত। ২০২৪ সালের আগস্টে বা তারও একটু আগে জুলাইয়ে যারা রাস্তায় নেমেছিল, আজ তারা দুর্বোধ্য রাজনৈতিক সমীকরণ দেখে হতবাক। আন্দোলনের ভাষা পুরনো। নেতৃত্ব প্রায় অপরিবর্তিত। আর কৌশল যেন নিজস্ব শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।
তিনি বলেন, যখন গোটা বাংলাদেশের মানুষ আন্তর্জাতিক সহযোগীরা নির্বাচন কবে হবে তা নিয়ে ব্যস্ত, তখনই সামনে আসছে সরকারের আশপাশের কিছু প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে টাকা পাচার- অর্থাৎ মানি লন্ডারিং এবং দুর্নীতির অভিযোগ। সিঙ্গাপুর, কানাডা, দুবাই এবং ইউরোপে অর্থপাচারের নানা তথ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। গণমাধ্যম এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে যেসব নাম উঠে আসছে তাদের অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ঘনিষ্ঠ আমলা কিংবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক। অথচ এই বিষয়গুলো নিয়ে সরকার নিশ্চুপ। এর ফলে এক ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়েছে বা তৈরি হচ্ছে যে, নির্বাচন এবং আন্দোলনের আবহের আড়ালে বড় ধরনের দুর্নীতির জবাবদিহি এড়াতে চাইছে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নিজেও এই ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। কিছু নেতার মুখে শোনা গেলেও দলগতভাবে এই গুরুতর অভিযোগকে রাজনৈতিক মঞ্চে প্রধান ইস্যুতে পরিণত করা হয়নি। অনেকে বলছেন, সরকারের সঙ্গে চলমান আলোচনার আবহে হয়তো বিএনপি নিজেই এই ইস্যুগুলো দাবিয়ে রাখছে। এতে করে আন্দোলনের মূলধারায় দুর্নীতি ও জবাবদিহির প্রশ্ন আসছে না। বরং সময় নির্ধারণের এককেন্দ্রিক রাজনীতি যেন সব কিছু ঢেকে দিচ্ছে।


0 Comments
http://bit.ly/3IieoTb